আসন সংখ্যা বাড়ছে না লোকসভার, ভোটাভুটি তে ফেল ডেলিমিটেসন বিল


The Expozious: 
আজ লোকসভায় একটি ঐতিহাসিক এবং নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল, ২০২৬ প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে। এই বিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা এবং মহিলাদের জন্য ৩৩% সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। বিলটি পাস না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার সম্পর্কিত ডিলিমিটেশন বিল, ২০২৬ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন (সংশোধন) বিল, ২০২৬-ও প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

বিলের মূল প্রস্তাবনা কী ছিল?

সরকারের প্রস্তাবিত এই বিলে ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল:
  • আসন বৃদ্ধি: লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ৮১৫টি আসন বিভিন্ন রাজ্যের জন্য এবং ৩৫টি আসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
  • জনগণনার ভিত্তি: ২০২৬ সালের পরবর্তী প্রথম জনগণনার জন্য অপেক্ষা না করে, ২০১১ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস (Delimitation) করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
  • মহিলা সংরক্ষণ: লোকসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা কার্যকর করার পথ সুগম করা।

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ডিলিমিটেশনের প্রভাব: উত্তর বনাম দক্ষিণ বিতর্ক

বিলের সবথেকে বিতর্কিত দিক ছিল ২০১১ সালের জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টনের প্রস্তাব। এর ফলে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরণের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা মূলত "উত্তর বনাম দক্ষিণ" বিতরককে উসকে দেয়।
১. উত্তর ভারতের আধিপত্য বৃদ্ধি:
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের ওপর ভিত্তি করে আসন বাড়ালে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো, বিশেষ করে "হিন্দি বলয়"-এর রাজ্যগুলো ব্যাপকভাবে লাভবান হতো।
  • উত্তর প্রদেশ: বর্তমানে ৮০টি আসন রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে তা বেড়ে ১২০টি বা তার বেশি হতে পারত, যা রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রায় ৫০% বাড়িয়ে দিত।
  • বিহার: আসন সংখ্যা ৪০ থেকে বেড়ে ৭০-এর কোঠায় পৌঁছাত।
  • সামগ্রিকভাবে, হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর (যেমন রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়) লোকসভায় অংশীদারিত্ব ৩৮.১% থেকে বেড়ে ৪৩.১% হতো।
২. দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্ব হ্রাস:
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো, যারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তাদের জন্য এই প্রস্তাব ছিল অশনিসংকেত। যদিও তাদের আসন সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়ত, কিন্তু মোট আসনের বিচারে তাদের প্রভাব (Share of Seats) কমে যেত।
  • কেরল ও তামিলনাড়ু: এই দুই রাজ্যের অংশীদারিত্ব সবচেয়ে বেশি কমার আশঙ্কা ছিল। তামিলনাড়ুর আসন ৩৯ থেকে বাড়লেও, মোট লোকসভায় তাদের শতাংশ ৭.১৮% থেকে কমে ৫.৮৮%-এ নেমে আসত।
  • সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর লোকসভায় অংশীদারিত্ব ২৪.৩% থেকে কমে ২০.৭%-এ দাঁড়াত।
৩. পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত:
পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশার মতো পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর আসন সংখ্যা বাড়লেও জাতীয় রাজনীতিতে তাদের আপেক্ষিক গুরুত্ব কিছুটা কমত। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব ৪.৪% থেকে কমে ৩.৮% হতো।

কেন বিলটি পাস হলো না?

সংবিধান সংশোধনের জন্য লোকসভায় উপস্থিত এবং ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
  • আজকের ভোটে বিলের পক্ষে ২৯৮ জন এবং বিপক্ষে ২৩০ জন এমপি ভোট দেন। প্রয়োজনীয় ৩৬০+ ভোটের সমর্থন না মেলায় স্পিকার বিলটি বাতিল ঘোষণা করেন।
  • বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, সরকার মহিলা সংরক্ষণের নামে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে চাইছে। দক্ষিণ ভারতের দলগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, এই বিল পাস হলে তাদের রাজ্যের মানুষের কণ্ঠস্বর সংসদে দুর্বল হয়ে পড়বে।

ভবিষ্যৎ কী?

বিলটি বাতিল হওয়ায় আপাতত লোকসভার আসন বাড়ছে না এবং পুরনো সীমানা অনুযায়ীই আগামী নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে। সরকার জানিয়েছে, এই বিলের ওপর ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সুফল পাওয়া রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে আসন বাড়ানো যায়, তা ঠিক করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
এই ঘটনার ফলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।

মন্তব্যসমূহ